ইন্টারনেট কীভাবে শুরু হলো: সামরিক গবেষণা থেকে মানুষের হাতের মুঠোয়
বিশ্বকে বদলে দেওয়া প্রযুক্তির গল্প:
আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও কঠিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে খবর
পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢোকা, অনলাইনে ক্লাস করা, ব্যাংকিং, অফিসের কাজ, ভিডিও
কল, কেনাকাটা কিংবা বিনোদন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট জড়িয়ে গেছে।
পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে
যোগাযোগ করা এখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই অসাধারণ যোগাযোগব্যবস্থার
শুরুটা মোটেও এত সহজ ছিল না। ইন্টারনেট কোনো একদিনে, কোনো এক ব্যক্তি বা একটি
প্রতিষ্ঠানের হাতে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের গবেষণা, সামরিক প্রয়োজন,
গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান, টেলিযোগাযোগ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের
সম্মিলিত প্রচেষ্টা। যে প্রযুক্তি আজ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে বৈশ্বিক
অর্থনীতি পর্যন্ত বদলে দিয়েছে, তার শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে বিংশ শতাব্দীর
মাঝামাঝি সময়ে।
শীতল যুদ্ধ ও
ইন্টারনেটের শুরুর গল্প
ইন্টারনেটের ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে তখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতা, যা ইতিহাসে শীতল যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে Sputnik 1 নামের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্যাধুনিক রকেট ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুনভাবে বিনিয়োগ শুরু করে। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় Advanced Research Projects Agency (ARPA)। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানটি DARPA নামে পরিচিত হয়। ARPAএর অন্যতম লক্ষ্য ছিল এমন প্রযুক্তি ও গবেষণা তৈরি করা, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে। তবে তখনও ‘ইন্টারনেট’ নামে কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
কম্পিউটার তখন
আজকের মতো ছিল না
আজকের
স্মার্টফোনের চেয়েও শক্তিশালী কম্পিউটিং ক্ষমতা আমাদের পকেটে থাকে। কিন্তু ১৯৫০ ও
১৯৬০-এর দশকে কম্পিউটার ছিল বিশাল আকারের, ব্যয়বহুল এবং মূলত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও
সামরিক কাজে ব্যবহৃত একটি যন্ত্র। একটি
বড় সমস্যা ছিল এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য আদান-প্রদান করা।
তখন কম্পিউটারগুলো অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করত। গবেষণাগারে
একটি কম্পিউটার থাকলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারের সঙ্গে সেটিকে সহজে যুক্ত করা
যেত না। এই
সমস্যার সমাধানের চিন্তা থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় এমন একটি নেটওয়ার্কের ধারণা,
যেখানে বিভিন্ন কম্পিউটার একে অপরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে।
প্যাকেট
সুইচিং: বিপ্লবী ধারণা
ইন্টারনেটের জন্মের পেছনে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ধারণাগুলোর একটি হলো Packet Switching বা প্যাকেট
সুইচিং। তৎকালীন টেলিফোন নেটওয়ার্কে সাধারণত একটি যোগাযোগের জন্য পুরো সংযোগপথ
নির্দিষ্ট করে রাখা হতো। কিন্তু কম্পিউটার ডেটা যোগাযোগের জন্য এটি খুব কার্যকর
ছিল না। বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলেন একটি বড় বার্তাকে যদি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে
পাঠানো যায়, তাহলে প্রতিটি অংশ নেটওয়ার্কের ভিন্ন পথ দিয়ে গন্তব্যে যেতে পারে। পরে
গন্তব্য কম্পিউটার সেই অংশগুলো আবার একত্র করে মূল তথ্য তৈরি করবে। এই ছোট ছোট
অংশগুলোকেই বলা হয় Packet। এই ধারণা ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ স্থাপত্যের অন্যতম
ভিত্তি হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক Paul Baran এবং
যুক্তরাজ্যের গবেষক Donald Davies-এর কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা
ভিন্ন ভিন্ন গবেষণাপ্রেক্ষাপটে প্যাকেটভিত্তিক যোগাযোগের ধারণা নিয়ে কাজ করেন।
ARPANET এর
জন্ম
১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে ARPA এমন একটি
কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
কম্পিউটার একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় ARPANET
Advanced Research Projects Agency Network। ১৯৬৯ সালকে ইন্টারনেটের ইতিহাসে একটি
গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। সেই বছর ARPANET-এর মাধ্যমে প্রথম কয়েকটি
কম্পিউটার নোড সংযুক্ত করা হয়। প্রথম সংযোগগুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর University of
California, Los Angeles (UCLA) থেকে Stanford Research Institute-এ একটি বার্তা
পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বার্তাটি ছিল ‘LOGIN’ শব্দটি। কিন্তু সিস্টেম পুরো শব্দটি
পাঠানোর আগেই সংযোগে সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে কেবল ‘LO’ পৌঁছেছিল। প্রযুক্তির
ইতিহাসে এটি নিখুঁত সাফল্যের গল্প নয়। বরং এটি দেখায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রযুক্তিগুলোর অনেকগুলোই শুরু হয়েছিল ছোট, অসম্পূর্ণ এবং পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ
দিয়ে।
ARPANET কীভাবে
কাজ করত?
ARPANET-এর সঙ্গে যুক্ত
কম্পিউটারগুলোকে বলা হতো Host। এগুলো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে
যোগাযোগ করত। তখনকার যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ছিল Interface
Message Processor (IMP)। সহজভাবে বললে, এটি কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কের মধ্যে
যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করত। একটি কম্পিউটার থেকে তথ্য পাঠানো হলে সেটি ছোট ছোট
প্যাকেটে ভাগ হয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গন্তব্যের দিকে যেত। এই ধারণা পরবর্তী
ইন্টারনেটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ই-মেইলের জন্ম
ARPANET চালু হওয়ার পর খুব দ্রুত বোঝা
গেল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক শুধু গবেষণার তথ্য আদান-প্রদানের জন্য নয়, মানুষের
যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটাতে পারে। ১৯৭১ সালে কম্পিউটার প্রকৌশলী Ray
Tomlinson নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি
করেন, যা পরবর্তীতে ই-মেইলের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ই-মেইল ঠিকানায় ব্যবহারকারীর নাম ও
কম্পিউটার/সিস্টেম আলাদা করার জন্য তিনি @ চিহ্ন ব্যবহার করেন। আজ আমরা
প্রতিদিন অসংখ্য ই-মেইল পাঠাই। কিন্তু @ চিহ্নের ব্যবহার যে একসময় কম্পিউটার
যোগাযোগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল, তা অনেকেরই জানা নেই।
একটি বড়
সমস্যা: সবাই কি একই ভাষায় যোগাযোগ করবে?
নেটওয়ার্ক বাড়তে থাকলে নতুন সমস্যা
দেখা দেয়। ধরা যাক, দুটি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলো। কিন্তু
যদি তাদের যোগাযোগের নিয়ম আলাদা হয়, তাহলে তারা একে অপরকে বুঝবে কীভাবে? এ সমস্যার
সমাধানে প্রয়োজন ছিল একটি অভিন্ন যোগাযোগ-প্রোটোকল। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন Vint
Cerf এবং Robert Kahn। তাঁরা এমন একটি কাঠামো তৈরির দিকে কাজ করেন, যার
মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এর ফল ছিল TCP/IP
প্রোটোকল স্যুট।
TCP/IP: আধুনিক
ইন্টারনেটের ভিত্তি
TCP/IP হলো এমন কিছু যোগাযোগবিধির
সমষ্টি, যার মাধ্যমে নেটওয়ার্কে তথ্য কীভাবে ভাগ হবে, কোথায় যাবে এবং কীভাবে গন্তব্যে
পৌঁছে আবার সঠিকভাবে সাজবে এসব নির্ধারিত হয়। সহজভাবে বলা যায়, TCP/IP হলো
ইন্টারনেটের একটি সাধারণ ভাষা। ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি ARPANET TCP/IP গ্রহণ করে।
এই ঘটনাকে ইন্টারনেটের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। এর
ফলে বিভিন্ন কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত
করার পথ অনেক বেশি সুগম হয়। তবে তখনও সাধারণ মানুষ আজকের মতো ওয়েবসাইট ব্রাউজ করতে
পারত না।
ইন্টারনেট আর
World Wide Web এক জিনিস নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
পরিষ্কার করা প্রয়োজন। Internet এবং World Wide Web একই জিনিস নয়। ইন্টারনেট
হলো বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, যার মাধ্যমে কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইস
একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আর World Wide Web হলো সেই ইন্টারনেটের ওপর
তৈরি একটি তথ্যব্যবস্থা, যেখানে ওয়েবসাইট, ওয়েবপেজ, লিংক ও ব্রাউজারের মাধ্যমে
তথ্য দেখা যায়। অর্থাৎ, ওয়েব হলো ইন্টারনেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ইন্টারনেট
নিজে পুরো বিষয়টি নয়।
Tim
Berners-Lee ও ওয়েবের জন্ম
১৯৮৯ সালে
ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী Tim Berners-Lee, যিনি তখন CERN-এ কাজ করছিলেন,
তথ্য আদান-প্রদানের একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব দেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল গবেষকদের মধ্যে তথ্য সহজে ভাগাভাগি করা।
এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় World Wide Web।
তিনি ওয়েবের জন্য কয়েকটি মৌলিক প্রযুক্তি তৈরি করেন:
HTML
ওয়েবপেজ তৈরির ভাষা। HTTP ওয়েব ব্রাউজার ও সার্ভারের মধ্যে যোগাযোগের নিয়ম।
URL ওয়েবের নির্দিষ্ট রিসোর্সের ঠিকানা এর সঙ্গে তিনি বিশ্বের প্রথম ওয়েব
ব্রাউজার ও ওয়েব সার্ভারও তৈরি করেন। ১৯৯১ সালে CERN-এর মাধ্যমে ওয়েব সাধারণভাবে
ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়।
ওয়েব উন্মুক্ত
হয়ে গেল সবার জন্য
ওয়েবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
ছিল এর উন্মুক্ততা। CERN ১৯৯৩ সালে ওয়েব প্রযুক্তির ওপর তাদের অধিকার উন্মুক্ত করে
দেয়, ফলে এটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। এরপর শুরু হয় ওয়েবের
বিস্ফোরণ।১৯৯০-এর দশকে Netscape Navigator-এর মতো ওয়েব ব্রাউজার সাধারণ মানুষের
কাছে ইন্টারনেটকে অনেক সহজ করে তোলে। মানুষ প্রথমবারের মতো ঘরে বসে ওয়েবসাইট খুলে
তথ্য পড়তে, ছবি দেখতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে শুরু
করে।
সার্চ ইঞ্জিন ও
গুগলের উত্থান
ওয়েবসাইট বাড়তে থাকলে নতুন সমস্যা
দেখা দিল এত ওয়েবসাইটের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া যাবে কীভাবে? এর সমাধানে
তৈরি হয় বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন। ১৯৯৮ সালে Larry Page এবং Sergey Brin প্রতিষ্ঠা
করেন Google। তাদের সার্চ প্রযুক্তি ওয়েবের বিপুল তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য
খুঁজে বের করার পদ্ধতিকে নতুন মাত্রা দেয়। ধীরে ধীরে Google বিশ্বের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম: ইন্টারনেটের নতুন যুগ
২০০০-এর দশকে ইন্টারনেটের চরিত্র আবার
বদলে যায়। আগে মানুষ মূলত ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য পড়ত। পরে মানুষ নিজেই কনটেন্ট তৈরি
করতে শুরু করে। ব্লগ, ফোরাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভিডিও শেয়ারিং
প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ঘটে। ২০০৪ সালে Facebook প্রতিষ্ঠার পর সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত জনপ্রিয় হয়। পরে YouTube, Twitter এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
ইন্টারনেটকে মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এখন ইন্টারনেট
শুধু তথ্যের জায়গা নয়; এটি মানুষের পরিচয়, যোগাযোগ, ব্যবসা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও
বিনোদনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম।
স্মার্টফোন
ইন্টারনেটকে পকেটে নিয়ে এলো
ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর
একটি আসে স্মার্টফোনের মাধ্যমে। আগে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য সাধারণত ডেস্কটপ বা
ল্যাপটপ প্রয়োজন হতো। কিন্তু স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে
ইন্টারনেট মানুষের পকেটে চলে আসে। বিশেষ করে 3G, 4G এবং পরবর্তীতে 5G প্রযুক্তি
মোবাইল ইন্টারনেটকে আরও দ্রুত ও সহজলভ্য করেছে। ফলে একজন মানুষ একই ডিভাইস দিয়ে
ফোন করা, ছবি তোলা, ভিডিও দেখা, সংবাদ পড়া, ব্যাংকিং, কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ
এবং কাজ সবকিছু করতে পারছেন।
বাংলাদেশে
ইন্টারনেটের আগমন
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায়
বাংলাদেশে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয় কিছুটা পরে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে ইন্টারনেট
সেবা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। শুরুতে এটি ছিল সীমিত,
ধীরগতির এবং ব্যয়বহুল। ডায়াল-আপ সংযোগের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হতো। তখন
কয়েক মিনিটের জন্যও সংযোগ স্থাপন করতে সময় লাগত, আর ওয়েবপেজ লোড হওয়া ছিল ধৈর্যের
পরীক্ষা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রডব্যান্ড, মোবাইল ইন্টারনেট এবং ফাইবার
অপটিক প্রযুক্তির বিস্তারে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে
ইন্টারনেট বাংলাদেশের শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যাংকিং,
সরকারি সেবা এবং সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইন্টারনেট
কীভাবে আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে?
ইন্টারনেটের প্রভাব কেবল প্রযুক্তির
মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার ধরনই পরিবর্তন করে দিয়েছে।
শিক্ষায়
পরিবর্তন: অনলাইন কোর্স, ডিজিটাল লাইব্রেরি,
ভিডিও লেকচার ও ভার্চুয়াল ক্লাসের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্ঞান
মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। ব্যবসায় পরিবর্তন: ই-কমার্স,
ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন পেমেন্ট ও রিমোট ওয়ার্ক ব্যবসার ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে পরিবর্তন:একসময় সংবাদ প্রকাশের জন্য
ছাপা কাগজ কিংবা টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি
ঘটনা পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
যোগাযোগে পরিবর্তন: চিঠির জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করার যুগ
শেষ। ই-মেইল, মেসেজিং ও ভিডিও কলের মাধ্যমে মুহূর্তেই যোগাযোগ সম্ভব।
কর্মসংস্থানে পরিবর্তন: ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট জব, অনলাইন উদ্যোক্তা
এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণের মতো নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
ইন্টারনেটের
অন্ধকার দিকও আছে
ইন্টারনেট যত সুযোগ তৈরি করেছে, তত
কিছু নতুন সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। ভুয়া খবর, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা,
ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সাইবার বুলিং, গোপনীয়তার ঝুঁকি এবং আসক্তি এসব এখন বড়
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে
যেতে পারে। আবার একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন সাইবার অপরাধী পৃথিবীর অন্য
প্রান্তের মানুষের তথ্য চুরি করতে পারে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে ডিজিটাল সচেতনতা
ও নিরাপত্তা এখন অপরিহার্য।
ইন্টারনেটের
ভবিষ্যৎ কোথায়?
ইন্টারনেটের
ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু কম্পিউটার বা মোবাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
Artificial Intelligence বা AI, Internet of Things (IoT),
Cloud Computing, 5G/6G, স্মার্ট সিটি, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন এবং ভার্চুয়াল ও
অগমেন্টেড রিয়েলিটির সঙ্গে ইন্টারনেট আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ঘরের ফ্রিজ থেকে গাড়ি, শিল্পকারখানা থেকে
হাসপাতাল অসংখ্য ডিভাইস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
অর্থাৎ ইন্টারনেট হয়তো ভবিষ্যতে এমন একটি প্রযুক্তি হয়ে উঠবে,
যা আমরা আলাদা করে ‘ব্যবহার’ করছি এমন অনুভূতিই হবে না। এটি আমাদের চারপাশের
অবকাঠামোর স্বাভাবিক অংশ হয়ে যাবে।
মূল কথা
ইন্টারনেটের ইতিহাস আসলে শুধু একটি প্রযুক্তির ইতিহাস নয়। এটি মানুষের কৌতূহল, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস। ১৯৬৯ সালে কয়েকটি কম্পিউটারের মধ্যে পরীক্ষামূলক যোগাযোগ থেকে শুরু করে আজকের বিলিয়ন বিলিয়ন ডিভাইসের বৈশ্বিক সংযোগ এই যাত্রা কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফল। একসময় কম্পিউটারগুলো ছিল আলাদা আলাদা দ্বীপের মতো। বিজ্ঞানীরা সেই দ্বীপগুলোকে যুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের পথ ধরে তৈরি হয়েছে ARPANET, TCP/IP, World Wide Web এবং পরবর্তীতে আজকের বিশাল ইন্টারনেট। আজ আমরা যখন একটি ওয়েবসাইট খুলছি, একটি ভিডিও কল করছি কিংবা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি বার্তা পাঠাচ্ছি, তখন এর পেছনে থাকা কয়েক দশকের গবেষণা ও সংগ্রামের কথা হয়তো মনে থাকে না।
কিন্তু ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় বিশ্ব
বদলে দেওয়া প্রযুক্তির শুরু অনেক সময় হয় খুব ছোট একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
‘LO’ দিয়ে শুরু হওয়া সেই অসম্পূর্ণ
বার্তাই একদিন এমন এক বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে, যার সঙ্গে আজ
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন সরাসরি যুক্ত।
ইন্টারনেটের গল্প তাই শেষ হওয়ার নয়।
এটি প্রতিনিয়ত নতুনভাবে লেখা হচ্ছে—আর সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় লিখছে বর্তমান
প্রজন্ম।
